আরাকান আর্মির নৃশংসতায় রোহিঙ্গাদের নতুন ঢল: প্রতিদিন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ৫০০’র বেশি



কক্সবাজার থেকে:

রাখাইনে আরাকান আর্মির দমন-পীড়ন ও সহিংসতার কারণে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন মিয়ানমারের মংডু অঞ্চলের বুড়া সিকদারপাড়া ও আশপাশের গ্রামের বহু মানুষ।

সরেজমিনে উখিয়ার বালুখালী ৫ নম্বর ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছেন। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চেয়েও ভয়াবহ নির্যাতন চালাচ্ছে আরাকান আর্মি।

রোহিঙ্গা নাগরিক মোহাম্মদ আলী বলেন, “গ্রামে আগুন লাগিয়ে দেয়ার পর আমরা সারারাত পালিয়ে ছিলাম। পরে আরাকান আর্মি আমাদের ধরে পিটিয়েছে।” তাঁর স্ত্রী জানান, “আমাদের জিম্মি করে রেখেছিল। কয়েকদিন লুকিয়ে থেকে পরিবার নিয়ে পালিয়ে এসেছি।”

নতুন আসা রোহিঙ্গাদের অনেকে জানান, তরুণ-তরুণীদের ধরে নিয়ে গিয়ে জোর করে শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে। বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। কেউ কেউ আবার ধর্ষণের অভিযোগও করেছেন।

একজন রোহিঙ্গা যুবক বলেন, “আমার এক আত্মীয়কে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে আরাকান আর্মি।” অন্যজন বলেন, “যাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের বাধ্য করছে নির্মাণকাজ ও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশ নিতে। না মানলে মারধর করছে।”

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। শুধু ২০২৪ সালের মে ও জুন মাসেই এই সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ জনের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছেন।

রোহিঙ্গা নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “আরাকান আর্মি ঘোষণা দিয়েছে—রোহিঙ্গা বলে কোনো জাতি থাকবে না। কেউ রোহিঙ্গা পরিচয় দিতে পারবে না। এটা গণহত্যার ইঙ্গিত।”

এদিকে, নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অনেকে মাদক ও চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। র‍্যাব ও বিজিবি সীমান্তে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে।

র‍্যাব-১৫ কক্সবাজার অঞ্চলের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসান বলেন, “বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে অনেক পণ্য চোরাচালান হচ্ছে। আমরা বিষয়টি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।”

২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান জানান, “মিয়ানমারে অস্থির পরিস্থিতির প্রভাব সীমান্তে পড়ছে। তবে সীমান্তে বিজিবির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।”

চলমান অনুপ্রবেশে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ক্যাম্পে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নিয়েও তৈরি হচ্ছে চরম সংকট। সীমান্তের ওপারে এখনও আগুনে পোড়া ঘরবাড়ি ও আরাকান আর্মির তাণ্ডবের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন

Choose Your Language